জাতীয় পার্টির বিরোধী দলের মর্যাদা থাকা নিয়ে প্রশ্ন

একাদশ জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন নিয়ে দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছেন জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা। এই অবস্থায় দলীয় সংসদ সদস্যরা ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে জাতীয় পার্টির বিরোধী দলের মর্যাদা আদৌ থাকবে কিনা- তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আর বিরোধী দলের মর্যদা না থাকলে নেতা নির্বাচনের প্রয়োজন পড়বে না। ফলে সংসদে জাতীয় পার্টির অবস্থান কী হবে, তা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত ১৪ জুলাই জাপা চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদের মৃত্যুতে বিরোধীদলীয় নেতার পদ শূন্য হয়। এরপর গত ৩ সেপ্টেম্বর নিজেকে বিরোধীদলীয় নেতা করার দলীয় সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে স্পিকারকে চিঠি দেন জাতীয় পার্টির বর্তমান চেয়ারম্যান জি এম কাদের।

এদিকে, ওই চিঠি গ্রহণ না করার অনুরোধ জানিয়ে গত বুধবার স্পিকারকে পাল্টা চিঠি লিখেছেন বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ। এরপর বৃহস্পতিবার এক সংবাদ সম্মেলনে রওশন এরশাদকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেছে দলটির একাংশ। এই অবস্থায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যদের বিভক্তি। দুপক্ষের এই পাল্টাপাল্টি অবস্থানে শুধু বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচন নয়, সংসদে জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ২(১)(ট) বিধিতে বলা হয়েছে, ‘বিরোধী দলের নেতা অর্থ স্পিকারের বিবেচনামতে যে সংসদ সদস্য সংসদে সরকারি দলের বিরোধিতাকারী সর্বোচ্চ সংখ্যক সদস্য লইয়া গঠিত ক্ষেত্রমত দল বা অধিসংঘের নেতা।’ সে হিসেবে বিরোধী দলের স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি স্পিকারের একক এখতিয়ারের বিষয়। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী, বিরোধীদলীয় সদস্যরা বসে তাঁদের নেতা নির্বাচন করবেন। এরপর স্পিকারকে তা লিখিতভাবে জানালে তিনি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন। ফলে বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের বিষয়টি নির্ভর করছে স্পিকারের ওপর। কিন্তু দুপক্ষের চিঠি পেলেও বিরোধীদলীয় নেতা নির্বাচনের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেননি স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্পিকার বলেন, আমি মালদ্বীপে স্পিকারস সামিট থেকে সবে ফিরলাম। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দুটি চিঠি পাঠানোর কথা শুনেছি। চিঠি দেখে পরবর্তীতে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

তবে জাতীয় পার্টির বিরোধী দলের মর্যদা থাকবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার অ্যাডভোকেট মো. ফজলে রাব্বী মিয়া। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, বিরোধী দলের নেতা কে হবেন- সেটি স্পিকারের ওপর নির্ভর করছে। জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্যরা সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত নিলে স্পিকার তাঁকে বিরোধীদলীয় নেতা ঘোষণা করবেন। আর বিভক্তি সিদ্ধান্ত হলে সংখ্যাগরিষ্ঠদের মতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত আসতে পারে। কিন্ত জাতীয় পার্টি বিভক্ত হয়ে গেলে তাঁদের বিরোধী দলের মর্যদা থাকতে পারে না। কারণ যদি ১০-১৫ জন সংসদ সদস্য নিয়ে কোনো দল একটি সংসদীয় গ্রুপ হতে পারে, সেখানে কোনো বিরোধীদলীয় নেতা থাকবেন না। এই অবস্থায় বিরোধী দল ও বিরোধীদলীয় নেতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট করে কিছু বলার সুযোগ নেই বলে জানান তিনি।

সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের সংবিধান ও জাতীয় সংসদের কার্যপ্রণালী বিধিতে সংসদের বিরোধী দল হতে ঠিক কতজন সদস্য প্রয়োজন- তা নির্ধারিত নেই। তবে ভারতের লোকসভার বিধান ও প্রচলিত রেওয়াজ অনুযায়ী বিরোধী দলের স্বীকৃতির জন্য ন্যূনতম ১০ শতাংশ অর্থাৎ ৩০টি আসন পেতে হবে। এ কারণে প্রথম সংসদে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংসদ নেতা নির্বাচিত হলেও ওই সংসদে কোনো বিরোধী দল বা বিরোধীদলীয় নেতা ছিলেন না।

বিষয়টি নিয়ে প্রথম সংসদে ১৯৭৩ সালের ১২ এপ্রিল একটি বিতর্কও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিরোধী পক্ষের স্বীকৃতি মিললেও বিরোধী দল বা নেতার স্বীকৃতি মেলেনি। এ ছাড়া মাত্র ১২দিন স্থায়ী ষষ্ঠ  সংসদও চলছে বিরোধী দল ছাড়াই। ওই সংসদে সরকারি দলের বাইরে থাকা কোনো দল প্রয়োজনীয় সংখ্যক আসন না পাওয়ায় বিরোধী দল বা তাঁদের নেতা নির্বাচিত হননি। তবে ১৯৮৮ সালে বিশেষ বিবেচনায় কয়েকটি দলের সদস্যদের নিয়ে গঠিত সম্মিলিত বিরোধী দলকে বিরোধী দল ও তাদের নেতা আ স ম আব্দুর রবকে বিরোধীদলীয় নেতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানান, সংসদের বিরোধী দল ও বিরোধীদলীয় নেতার বিষয়ে বঙ্গবন্ধুর দেওয়া ভাষণই একমাত্র নির্দেশনা। ১৯৭৩ সালের ১২ এপ্রিল সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তৎকালীন সংসদ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘সংসদীয় কনভেনশন অনুযায়ী পাঁচ-সাতজন সদস্য নিয়ে গঠিত কোনো গ্রুপের নেতাকে বিরোধী দলের নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া যায় না। তেমনি ২৫ জনের কম সদস্য নিয়ে গঠিত কোনো দলকে বিরোধী দল হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুযোগ নেই।’

 

উত্তর দিন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রচার করা হবে না.

ফেইসবুক